Tuesday, December 31, 2019
Monday, December 16, 2019
সাধারণ জ্বর (General Fever)- (১ম পর্ব)
সাধারণ জ্বরঃ
জ্বর একটি সাধারণ উপসর্গ। বিভিন্ন রোগের উপসর্গ হিসেবে জ্বর হয়ে থাকে। জ্বর হলে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেড়ে যায়।শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা হচ্ছে ৯৮•৬ ফারেনহাইট (মুখগহ্বরে জিহ্বার নিচে) এই তাপমাত্রা বেড়ে গেলেই আমরা তাকে জ্বর বলতে পারি। আর দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি মানে হল, দেহে পাইরোজেন (Pyrogens) উৎপন্ন হয়েছে।
সদৃস্য নামঃ
সাধারণ
ঠান্ডা-জ্বর, সর্দি জ্বর, সাধারণ জ্বর, সাধারণ সর্দি, সিজোনাল
জ্বর, সিজোনাল সর্দি-কাশি, সাধারন হাচি-কাশি ইত্যাদি।
পাইরোজেন কি (Pyrogens)
পাইরোজেনকে বলা হয় Thermostavle Bacterial Toxin, মানে তাপজীবাণুঘটিত বিষ। এই বিষ শরীরের যেসব কলকব্জাগুলো তাপমাত্রা
স্বাভাবিক রাখে তাদের বিকল করে দেয়, আর অমনি আমাদের
পাইরেকশিয়া দেখা দেয়। রোগ নিরুপিত হবার আগ পর্যন্ত জ্বরকে ডাক্তারী ভাষায় বলা
হয় Pyrexia বা পাইরেকশিয়া। পাইরোজেনের প্রধান কাজ
হল বাইরে থেকে বড় যে আক্রমণ অন্য জীবাণুরা করেছে, তাদের প্রতিরোধ
করার চেষ্টা করা। পাইরোজেন যখন এই চেষ্টা করে তখন শরীরের হরমোন, এনজাইম ও রক্তকণিকাদের (মূলত শ্বেত কণিকা বা থ্রম্বোসাইটদের) খুব দ্রুত
সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটে যাতে করে বাইরের শত্রুদের ঠেকানো সম্ভব হয়। শত্রুরা আমাদের দেহে
আক্রমণ করলে আমাদের দেহ থেকে প্রচুর পাইরোজেন নিসৃত হতে থাকে। পাইরোজেন আমাদের
দেহের সব জায়গা থেকে খুঁজে খুঁজে জীবাণুদের মারতে শুরু করে। এখন দেহের সব
জায়গায় যদি পাইরোজেন গিয়ে গিয়ে জীবাণুদের মেরে ফেলতে চায়, সে কিভাবে সব
জায়গায় যাবে?? যাবার পথ একটাই হতে পারে, রক্ত। পাইরোজেন রক্তের মাধ্যমে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। এই রক্তের মাধ্যমে
কিছু কিছু পাইরোজেন আবার পৌছে যায়, আমাদের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস
অঞ্চলে। হাইপোথ্যালামাস পাইরোজেনের সংস্পর্শে এলেই মস্তিষ্কের ভেতরের দিকের
আর একটা অঞ্চল, ভেসোমোটরে সংকেত পাঠায় যে, দেহে শত্রুরা আক্রমণ করেছে। ভেসোমোটর করে কি, দেহের সব রোমকূপ দেয় বন্ধ করে, যেন আর বাড়তি কোন
জীবানূ ঢুকতে না পারে। সেইসাথে আমাদের রক্তনালীগুলোকেও সংকুচিত করে দেয়, যেন পাইরোজেন সহজেই জীবাণুদের ধরে ধরে মারতে পারে। রক্তনালী সংকুচিত হলে
রক্ত প্রবাহের গতি যায় বেড়ে, তাপ উৎপন্ন হয়। সাথে আমাদের
দেহে ক্রমাগত কিছু তাপ তো উৎপন্ন হচ্ছেই। রোমকূপ বন্ধ থাকার ফলে আমাদের
দেহের ভেতরে যে তাপ উৎপন্ন হচ্ছে, তা আর বের হতে পারে না। আমাদের দেহের
তাপমাত্রা যায় বেড়ে।
শরীরের তাপমাত্রা বা Body Temperature বলতে আমাদের দেহের ভিতরের (Core) অঙ্গের (যকৃত,
মস্তিষ্ক, ফুসফুস ইত্যাদি) তাপমাত্রাকে বোঝায়।
একে Core body Temperature বলে। এই Core Temperature-এর স্বাভাবিক সীমা সাধারণত ৩৬°C-৩৭.৫°C (97°
to 99.5°F)।
Set point হলো হাইপোথ্যালামাসের একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, যেটাকে সে স্বাভাবিক মনে করে আর ওই অনুযায়ী দেহের তাপমাত্রা কমায় বা
বাড়ায়। স্বাভাবিক set point হলো ৩৬°C-৩৭.৫°C। অর্থাৎ দেহের তাপমাত্রা ৩৬°C বা ৩৭.৫°C-এর
কম বা বেশি হলে সে তাপ বাড়াতে বা কমাতে সাহায্য করবে। কিন্তু যেসব কারণে জ্বর হয়,
যেমন ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের আক্রমণে, এরা
হাইপোথ্যালামাসের Set point বাড়িয়ে দেয়। ধরা যাক কোনো ভাইরাস
বা ব্যাকটেরিয়া Set point 36°C থেকে 40°C করে দিলো। এখন হাইপোথ্যালামাস এই নতুন Set Point-কে
(40°C) স্বাভাবিক মনে করে দেহের তাপমাত্রা বাড়িয়ে 40°C-এ নিয়ে যাবে এবং জ্বর হবে।
হাইপোথ্যালামাসঃ
আমাদের দেহের তাপমাত্রা
প্রধানত নিয়ন্ত্রিত হয় মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস নামক অংশের “থার্মো রেগুলেটরি
সেন্টার (তাপ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র)” থেকে। হাইপোথ্যালামাসের এই
অংশের কাজ হলো আমাদের পুরো দেহে তাপমাত্রা সংবেদনশীল/পরিমাপক যে রিসেপ্টরগুলো
ছড়িয়ে আছে, সেখান থেকে তথ্য নিয়ে দেহকে গরম অথবা ঠাণ্ডা করার
প্রক্রিয়া চালু রাখা। আমরা উষ্ণ রক্তের প্রাণী। ঠাণ্ডা আমাদের সহ্য হয় না। তাই
ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় আমাদের দেহের তাপমাত্রা পরিমাপক/সংবেদনশীল রিসেপ্টরগুলো
মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে তথ্য পাঠায় যে, বাইরে খুব ঠাণ্ডা,
শরীর শীতল হয়ে যাচ্ছে! তখন হাইপোথ্যালামাসের তাপ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র
দেহের তাপ উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। খুব সহজ একটা চিহ্ন আছে যেটা দিয়ে বুঝা যায় দেহের
তাপ বেড়ে যাচ্ছে। চিহ্নটা হল কাঁপুনি (Shivering)। দেহের কংকালপেশী অল্প অল্প
নড়াচড়ার মাধ্যমে শক্তি খরচ করে উৎপন্ন করে তাপ। পেশীর এই নড়াচড়াই আমরা কাঁপুনি
হিসেবে টের পাই। দেহের বিপাক ক্রিয়া/মেটাবলিজম বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমেও
হাইপোথ্যালামাস তাপ উৎপন্ন করে।
দেহের তাপ উৎপাদন প্রক্রিয়াঃ
বিপাক ক্রিয়া বা মেটাবলিজম (Metabolism) হলো দেহের তাপমাত্রা উৎপাদনের প্রধান উৎস।
কোষের ভেতর খাদ্য ভেঙে শক্তি ও তাপ উৎপাদন করার প্রক্রিয়াকে বিপাক ক্রিয়া বলে। যখন
দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রয়োজন হয়, তখন সিম্প্যাথেটিক নিউরোট্রান্সমিটার
(Sympathetic neurotransmitters) নামে পরিচিত Epinephrine এবং Nor-epinephrine
নিঃসৃত হয়। এই নিউরোট্রান্সমিটার একদম কোষীয় পর্যায়ে কাজ করে। এরা
বিপাক ক্রিয়াকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন কমায়, তাপ
উৎপাদন বাড়ায়। জ্বর হলে যে শরীর দুর্বল হয়, তার সম্ভাব্য
কারণের মধ্যে এটা একটা। কারণ তখন বিপাক ক্রিয়া থেকে শক্তি উৎপাদন কমে যায় কিন্তু
শরীরের তাপ উৎপাদন বেড়ে যায়। ফলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায় আর কম শক্তি উৎপাদিত
হওয়ার কারণে শরীর দুর্বল হয়ে যায়। বিপাক ক্রিয়া থেকে শক্তি উৎপাদন বাড়িয়ে দুর্বলতা
কমানোর জন্য থাইরয়েড হরমোন নিঃসরণ বাড়ে, কিন্তু প্রক্রিয়াটি
পুরোপুরি কার্যকরী হতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। এজন্য জ্বর ভালো হলেও শরীর
কিছুদিন দুর্বল থাকে।
দেহ থেকে তাপ নিঃসরণ প্রক্রিয়াঃ দেহের অধিকাংশ তাপ উৎপন্ন হয় মাংসপেশীতে আর অন্ত্রে। এসব অঙ্গ সাবকিউটেনিয়াস টিস্যু দিয়ে আবৃত থাকে, যা তাপ বাইরে যেতে বাধা দেয়। দেহ থেকে অধিকাংশ তাপ বের হয়ে যায় ত্বকের মাধ্যমে। তাছাড়া নিম্নোক্ত পদ্ধতিতেও তাপ বের হতে পারে, যার সবগুলোই নিয়ন্ত্রিত হয় হাইপোথ্যালামাসের তাপ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকেঃ
১) ঘামের মাধ্যমে
২) শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে
৩) পায়খানা ও প্রসাবের
মাধ্যমে
৪ বিকিরণের (radiation) মাধ্যমে
৫) পরিবহনের মাধ্যমে-
(রক্ত বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের তাপ পরিবহন করে ত্বকে নিয়ে
আসে। তারপর ত্বক থেকে তাপ বের হয়ে যায়)
৬) বাষ্পীকরনের মাধ্যমে।
জ্বর কোন রোগ নয়: একটু জ্বর হলেই আমরা ঘাবড়ে যায়। কিন্তু
বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি লোকও পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার কোনদিন একবারও জ্বর হয়নি। জ্বর কিন্তু
কোনও রোগ নয়। বহু অসুখের একটি উপসর্গ। এটা খুব গুরুত্বপুর্ণ
যে, শুধু জ্বর বলে কিছু হয় না।
এটা যে কোন রোগের বাইরের চেহারা। স্বর্দি-কাশি হলে জ্বর হতে পারে, ম্যালেরিয়া হলেও হতে পারে। আবার পড়ে গিয়ে হাত-পা কেটে গেলেও হতে জ্বর হতে
পারে। টাইফয়েড, টি.বি সবার সাথেই জ্বর আছে!
জ্বরের প্রকার : সাধারণত জ্বর তিন ধরনের হয়ে থাকে-
১। কন্টিনিউড (Continued): জ্বর এর মাত্রা যখন ২৪ ঘণ্টায় ১ সেন্টিগেড বা ১.৫
ফারেনহাইট তারতম্য হয়; কিন্তু জ্বর কোন সময় স্বাভাবিক
অবস্থায় আসে না, তখনই তাকে কন্টিনিউড জ্বর বলে।
২। রেমিটেন্ট (Remitent): যখন জ্বরের মাত্রা ২৪ ঘণ্টায় ২ সেলসিয়াস বা ৩ ফারেনহাইট
তারতম্য হয়, তাকে রেমিটেন্ট জ্বর বলে।
৩। ইন্টারমিটেন্ট (Intermitent): যখন জ্বর দৈনিক কয়েক ঘণ্টা শরীরে উপস্থিত থাকে, তখন তাকে ইন্টারমিটেন্ট জ্বর বলে। এই ইন্টারমিটেন্ট জ্বর যদি প্রতিদিন আসে
তখন তাকে কোটিডিয়ান জ্বর বলে। একদিন পরপর এলে টার্শিয়ান এবং দুই দিন পরপর এলে
কোয়ার্টান জ্বর বলে। তবে এখন জ্বর নিরাময় ওষুধ এবং অ্যান্টিবায়োটিক ও অন্যান্য
ওষুধ সেবনের ফলে এই জ্বরের শ্রেণীবিন্যাস সব সময় বোঝা যায় না।
চলবে....................................
লেখকঃ ডাঃ বিজন বিশ্বাস, ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট – প্রতিবন্ধী সেবা ও
সাহায্য কেন্দ্র, রূপসা, খুলনা এবং পরিচালক – আদিত্য ক্লিনিক। স্বাস্থ্য বিষয়ক
সম্পাদক –দৈনিক সুবর্ণ নিউজ। মোবাঃ ০১৬১১-১৮১৬৫৭।
Subscribe to:
Comments (Atom)
ডাঃ স্যামুয়েল হ্যানেমান (হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার জনক)
খৃস্টান ফ্রেডরিখ স্যামুয়েল হ্যানিম্যান ( জার্মান : [ ha ː n ə man ] 10 এপ্রিল 1755 - 2 জুলাই 1843) - ক্রিশ্চিয়ান ফ্রেড্রিক স্যামুয়...
-
সেরিব্রাল পলসিঃ কারন, প্রতিকার ও চিকিৎসা - ১ম পর্বের পর .................. পরিক্ষা পদ্ধতিঃ যেভাবে সেরিব্রাল পলসি শনাক্ত করা হয় - · ...
-
সেরিব্রাল পলসি কি ? সেরিব্রাল পলসি হল এক ধরনের স্নায়বিক ভারসাম্যহীনতা যা বাচ্চাদের মস্তিষ্ক গঠনের সময় কোন প্রকার আঘাত জনিত কারণে বা স্নায়ু...
-
সাধারণ জ্বরঃ জ্বর একটি সাধারণ উপসর্গ। বিভিন্ন রোগের উপসর্গ হিসেবে জ্বর হয়ে থাকে। জ্বর হলে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেড়...
-
২য় পর্বের পর .................. জ্বর প্রতিরোধের উপায়ঃ আসলে প্রতিরোধ করাটাই আমাদের দরকার। কেউ সামনে হাঁচি দিল , কারো হাতে হয়তো জীবাণু র...
-
সাধারণ জ্বর (General Fever)- ১ম পর্বের পর ................ কারনঃ ১। বিভিন্ন ইনফেকশন- যেমন ফোঁড়া , কার্বাংকল , ফুরাংকল । ২। ...
-
মানবদেহের প্রতিটি কোষের কেন্দ্রে ক্রমোজমের ভেতরের ডিএনএ কে বলা হয় বংশগতির ধারক ও বাহক। মানুষের শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য যেমন আচার-আচরণ ,...
-
ক্লাবফুট কি ? ক্লাবফুট বা মুগুর পা বা কোষ পা কিংবা বাঁকা পায়ের পাতা (Talipes equinoverus – নামেও পরিচিত) শিশুর এক ধরনের জন্মগত ত্রুটি। এটি...
-
খৃস্টান ফ্রেডরিখ স্যামুয়েল হ্যানিম্যান ( জার্মান : [ ha ː n ə man ] 10 এপ্রিল 1755 - 2 জুলাই 1843) - ক্রিশ্চিয়ান ফ্রেড্রিক স্যামুয়...
-
সেরিব্রাল পলসিঃ কারন, প্রতিকার ও চিকিৎসা - ২য় পর্বের পর ................. চিকিৎসা পদ্ধতিঃ বাবা-মা-রাই প্রথম লক্ষ্য করতে পারেন তাঁদের...


