ক্লাবফুট কি?
ক্লাবফুট বা মুগুর
পা বা কোষ পা কিংবা বাঁকা পায়ের পাতা (Talipes equinoverus – নামেও পরিচিত) শিশুর
এক ধরনের জন্মগত ত্রুটি। এটি
আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহার করে গর্ভে বা জন্মের পরে সনাক্ত করা যেতে পারে। জন্মগত ত্রুটি শিশুর শরীরের এক ধরনের সমস্যা যা শিশুর জন্মের সময় থেকেই দেখা
দেয়। এই ত্রুটি শিশুর এক বা একাধিক অঙ্গের গঠনের উপর সাময়িক বা স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। সেই সাথে
শিশুর পুরো শরীরের গঠন ও বিকাশের বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। আপনার শিশু ক্লাবফুট
নিয়ে জন্ম গ্রহন করলে তার এক বা উভয় পা-ই ভিতরের দিকে বা নিচের দিকে বাঁকানো
থাকবে। হাড়ের সাথে মাংসের ঠিকঠাক সংযোগ রাখতে টেন্ডন নামক এক ধরনের টিস্যু কাজ
করে। এই টেন্ডনের দৈঘ্য যদি অস্বাভাবিক ভাবে কম হয়, তাহলে পায়ে এক ধরনের বিকৃতি
দেখা যায়। এছাড়া পায়ের হাড়ের ও মাংসের কোন সমস্যার কারনেও ক্লাবফুট হতে পারে।
গ্লোবাল ক্লাবফুট ইনিশিয়েটিভের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে এই সমস্যা নিয়ে
জন্ম নেয়া শিশুর হার প্রতি হাজারে এক দশমিক দুই। আর বাংলাদেশে বছরে ৪ হাজার ৩৭৩টি
শিশু ক্লাবফুট (বাঁকা পা) নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। ২০১০ সাল থেকে বিএসএমএমইউ
বিনামূল্যে শিশুদের জন্মগত বাঁকা পায়ের চিকিৎসা দেয়া শুরু করে।
ক্লাবফুটের কারণগুলি:
কি কারণে ক্লাবফুট হয় তার উত্তর অজানা। আর সেই কারনেই এর প্রতিরোধের ব্যবস্থা ও অজানা। যেহেতু এটি একটি জন্মগত ত্রুটি, জেনেটিক্স এই অবস্থার বিকাশে একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে। যাইহোক, অন্যান্য বিভিন্ন কারণের কারণে আপনার শিশুর ক্লাব ফুট হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে যেমন: ১) লিঙ্গ:-মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের ক্লাবফুট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
২) বয়স:-40 বছরের বেশি বয়সী গর্ভবতী মহিলাদের জন্ম দেওয়া শিশুর ক্লাবফুট হবার সম্ভাবনা বেশি।
৩) জন্মগত অবস্থা:-কঙ্কাল বা মেরুদণ্ডে জন্মগত অস্বাভাবিকতা যেমন স্পাইনা বিফিডা আপনার শিশুকে এই অবস্থার বিকাশের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
৪) ধূমপান:-গর্ভাবস্থায় ধূমপান বা ধোঁয়া শ্বাস নেওয়ায় আপনার শিশুর ক্লাবফুট হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
৫) পারিবারিক ইতিহাস:-পিতামাতার একজন বা তাদের অন্য সন্তানের যদি ক্লাবফুট থাকে, তবে শিশুরও এটি হওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
৬) গর্ভাবস্থায়
পর্যাপ্ত অ্যামনিওটিক তরল না থাকা:-গর্ভের শিশুকে ঘিরে থাকা তরল খুব কম হলে ক্লাবফুটের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।
শিশুদের
ক্লাবফুট নির্দেশ করে এমন কয়েকটি লক্ষণ হল:
১) পেঁচানো পা:- যদি আপনার শিশু এই অবস্থায় ভোগে, তাহলে তার পা পেঁচানো এবং নিচের দিকে ও ভেতরের দিকে বাঁকানো, খিলান বাড়াতে এবং গোড়ালিটিকে ভেতরের দিকে ঘুরিয়ে দেখাতে পারে। পা এত তীব্রভাবে ঘুরতে পারে যে এটি আসলে মনে হতে পারে যেন এটি উল্টে গেছে।
২) অনুন্নত পেশী:- ক্লাবফুটে বাচ্চাদের অনুন্নত পেশী থাকে এবং তাই তারা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
৩) খাটো পা:- পা শরীরের অনুপাতে ছোট হতে পারে। যদি শুধুমাত্র একটি পা আক্রান্ত হয়, তাহলে সেই পা অন্য পায়ের চেয়ে খাটো হবে।
শিশুদের
ক্লাবফুটের চিকিৎসা
কোথায় করানো হয়ঃ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
(বিএসএমএমইউ) -এর ডি-ব্লকের সার্জারি বিভাগের ১০৩নম্বর রুমে শিশুদের ক্লাবফুটের চিকিৎসা করানো হয়। শিশুদের প্রতিবন্ধিতা দূরীকরণে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের
আওতায় পরিচালিত হচ্ছে— ‘দ্য ন্যাশনাল ক্লাবফুট
প্রোগ্রাম অব বাংলাদেশ’। এটি যৌথ ভাবে পরিচালনা করে দ্য গ্লেনকো ফাউন্ডেশন
ও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। দেশের ২৭টি সরকারি হাসপাতাল ও ছয়টি
বেসরকারি ক্লিনিকে “ওয়াক ফর লাইফ” এই প্রকল্পের মাধ্যমে ক্লাবফুটের চিকিৎসা করানো হয়। এছাড়া “জিরো ক্লাবফুট” নামে একটি সংগঠন ক্লাবফুটের চিকিৎসা করে আসছে। সমাজকল্যাণ
মন্ত্রণালয়ের আওতায় জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন পরিচালিত প্রতিবন্ধী সেবা ও
সাহায্য কেন্দ্র (সারা দেশে ১০৩টি) গুলোতে ক্লাবফুটের
প্রাথমিক ও পুনর্বাসন চিকিৎসা দিয়ে থাকে।
শিশুদের
ক্লাবফুটের চিকিৎসা:
পায়ের কার্যকারিতা পুনরুদ্ধার
করতে এবং পায়ে ব্যথা কমাতে জন্মের পরের প্রথম সপ্তাহগুলিতে যত দ্রুত সম্ভব নিম্নের
চিকিৎসা শুরু করা উচিৎ:-
১) স্ট্রেচিং:- মৃদু
ক্ষেত্রে, স্ট্রেচিং
আপনার সন্তানের পায়ের পরিবর্তন এবং সারিবদ্ধ করতে সাহায্য করতে পারে। আপনার শিশুর
পা প্রসারিত করার জন্য ব্যবহৃত কৌশলগুলি হল:
১.১-পনসেটি পদ্ধতি:- এই
পদ্ধতিতে, ডাক্তার
পায়ের বাঁক ঠিক করার জন্য তার হাত ব্যবহার করে শিশুর পা প্রসারিত করবেন। পাদদেশটি
অবস্থানে আনার পরে, ডাক্তার
একটি প্লাস্টার
দিয়ে পা মুড়িয়ে দেবেন এবং এটি ততদিন চালিয়ে যাবেন যতদিন না এটি সঠিক আকারের হয়।
১.২-ফরাসি পদ্ধতি:- ফরাসি
পদ্ধতিতে ডাক্তার প্রতিদিন শিশুর পা প্রসারিত করে এবং এটিকে অবস্থানে রাখার জন্য
আঠালো টেপ প্রয়োগ করে। এই ডাক্তার আপনার সন্তানের চিকিতসা করার জন্য এই পদ্ধতিটি
ব্যবহার চালিয়ে যাবেন যতক্ষণ না তার বয়স ছয় মাস না হয়।
সার্জারি:- যদি
উপরোক্ত পদ্ধতিতে ক্লাবফুট সংশোধন না হয় ক্ষেত্রে সার্জারি করা যেতে পারে। অস্ত্রোপচারটি
পায়ের বিভিন্ন অংশ যেমন হাড়,
জয়েন্ট, পেশী, টেন্ডন এবং
লিগামেন্টগুলিকে সারিবদ্ধ করতে এবং তাদের অবস্থান সংশোধন করতে সহায়তা করে।
লেখকঃ ডাঃ বিজন বিশ্বাস, ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট – প্রতিবন্ধী সেবা ও
সাহায্য কেন্দ্র, রূপসা, খুলনা এবং পরিচালক – আদিত্য ক্লিনিক। স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক –দৈনিক সুবর্ণ নিউজ। মোবাঃ ০১৬১১-১৮১৬৫৭।


No comments:
Post a Comment