মানবদেহের প্রতিটি কোষের কেন্দ্রে ক্রমোজমের ভেতরের ডিএনএ কে
বলা হয় বংশগতির ধারক ও বাহক। মানুষের শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য যেমন আচার-আচরণ, বুদ্ধিমত্তা, চেহারা, উচ্চতা, গায়ের রং—এ সব কিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় ডিএনএর মাধ্যমে।
তাই ডিএনএ বা ক্রমোজমের কোনো রকম অসংগতি হলে মানুষের
শারীরিক ও মানসিক নানা ত্রুটি দেখা দেয়। এগুলোকে বলে জেনেটিক ত্রুটি। মানবদেহে
প্রতিটি কোষে ক্রমোজমের সংখ্যা থাকে ৪৬টি। ডাউন সিনড্রোম ব্যক্তির ক্ষেত্রে
প্রতিটি দেহকোষে ২১তম ক্রমোজমে একটি অতিরিক্ত ক্রমোজম থাকে, যাকে ‘ট্রাইসমি ২১’ বলা হয়। এই অতিরিক্ত ক্রমোজমটির কারণে
বিশেষ কিছু শারীরিক ও মানসিক ত্রুটি নিয়ে ডাউন সিনড্রোম শিশুর জন্ম হয়। ১৮৮৬ সালে ইংল্যান্ডে
জন ল্যাংডন ডাউন নামে এক ব্যক্তি এটি আবিষ্কার করেন। তখন থেকেই এটি ডাউনস সিনড্রোম
বা শুধু ডাউন সিনড্রোম বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্থান পায়।
কিন্তু সমস্যা হলো, ২১তম ক্রমোজমের অসংগতির ফলে ডাউন সিনড্রোম
দেখা দেয়, এটা জানা গেলেও ঠিক কোন কোন কারণে এ অসংগতি হতে
পারে, তা সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আজো নিশ্চিত হতে পারেননি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) তথ্য মতে, বিশ্বে প্রতি ৮০০ শিশুর
মধ্যে একজন ডাউন সিনড্রোম শিশু জন্মগ্রহণ করে থাকে। পৃথিবীতে প্রায় ৭০ লাখ ডাউন
সিনড্রোম লোক রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশে প্রতিদিন ১৫
জন ডাউন শিশু জন্ম নেয় এবং দেশে প্রতি বছর পাঁচ হাজার ডাউন শিশু জন্মায়। দেশে
প্রায় দুই লাখ শিশু এ সমস্যায় ভুগছে।
লক্ষণঃ
ডাউন
সিনড্রোম লক্ষণ নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের কিছু শারীরিক ও স্নায়বিক লক্ষণ দেখা যায়।
যেমন—
১) এই শিশুগুলো খুব নরম তুলতুলে হয়।
২) অনেকের মধ্যে
জিহ্বাটা একটু বের করে রাখার প্রবণতা থাকে। মুখমণ্ডল ছোট হয়, থুতনি সেভাবে বোঝা যায় না, গলা ছোট হয়।
৩) এ শিশুদের মাংসপেশির শিথিলতা, বামনতা বা কম উচ্চতা,
চোখের কোণ ওপরের দিকে ওঠানো, চ্যাপ্টা নাক,
ছোট কান, হাতের তালুতে একটিমাত্র রেখা ইত্যাদি
বৈশিষ্ট্যও দেখা যায়।
৪) কানে কম শোনা, কথা বলতে দেরি হওয়া, কম বুদ্ধি ইত্যাদি জটিলতা থাকে।
৫) হাঁটাচলা ও মাংসপেশির গঠন সঠিক হয় না।
৬) আইকিউ
বা বুদ্ধিমত্তা অনেক কম হয়।
৭) অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্তরা কথা
বলার শক্তি হারিয়ে ফেলে।
৮) কিছু ক্ষেত্রে আক্রান্তদের অল্প
বয়সেই হৃদরোগের সমস্যা হয়। আর কিছু ক্ষেত্রে বয়স বাড়লে হার্টের সমস্যা গুরুতর হয়ে
ওঠে।
৯) টেস্টিকুলার ক্যান্সার ও লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার
আশঙ্কা বেশি থাকে।
১০) দাঁতে সংক্রমণ বা দাঁত পড়ে যাওয়া
ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়।
১১) জন্মগতভাবে কিছু রোগ যেমন—অ্যানেটশন ডিফিক্ট হাইপার অ্যাকটিভিটি (এডিএইচডি) হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শনাক্তের উপায়ঃ উন্নত দেশগুলোতে গর্ভবতী মাকে ডাউন সিনড্রোম শিশু এবং অন্যান্য সম্ভাব্য জন্মগত ত্রুটি নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনাগত শিশুটি ডাউন সিনড্রোম শিশু কি না, রক্তের ক্রমোজম সংখ্যা বা ক্যারিওটাইপিং পরীক্ষার মাধ্যমেই তা নিশ্চিত হওয়া যায়।
গর্ভাবস্থার ১১ থেকে ১৪ সপ্তাহের মধ্যে প্রাথমিক গর্ভফুল
থেকে কোষকলা সংগ্রহের মাধ্যমে অথবা ১৫ থেকে ১৮ সপ্তাহের মধ্যে গর্ভস্থ শিশুর চারপাশের
তরলের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। তখন আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে, মায়ের রক্ত নিয়ে বা
মায়ের পেটের পানি, ভ্রূণের টিস্যু ইত্যাদি নিয়ে পরীক্ষা করা
যায়। এরপর মা-বাবা গর্ভাবস্থা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আশার
কথা যে এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখন বাংলাদেশেই করা যায়।
করণীয়ঃ ডাউন সিনড্রোম কোনো রোগ নয়, তাই এটি নিরাময় হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে সঠিক সময়ে লক্ষণগুলো চিহ্নিত করে সঠিক পরিচর্যা, পুষ্টিকর খাবার, স্পিচ, ল্যাঙ্গুয়েজ ও ফিজিক্যাল থেরাপি দিলে তারা অন্য স্বাভাবিক শিশুর মতো পড়ালেখা করে কর্মক্ষম বা স্বনির্ভর হতে পারে অথবা প্রয়োজনীয় পরিচর্যায় শারীরিক সমস্যাগুলো কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
মনে রাখতে হবে, ডাউন সিনড্রোম প্রতিরোধের কোনো উপায় নেই।
মায়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাউন শিশু হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে বিধায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে
অধিক বয়সে, বিশেষ করে পঁয়ত্রিশোর্ধ্ব বয়সে মা হওয়াকে
নিরুৎসাহিত করা হয়। আবার মায়ের আগের সন্তান যদি ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত থাকে,
তবে পরবর্তী সময় সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
উচিত।
পাশাপাশি পরিবেশদূষণ রোধসহ গর্ভবতী মায়ের উচিত ভেজাল খাদ্য
ও ভেজাল প্রসাধনী বর্জন করা, তেজস্ক্রিয়তা এড়িয়ে চলা ইত্যাদি। এসব কারণেও ডাউন শিশুর জন্ম
হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
লেখকঃ ডাঃ বিজন বিশ্বাস, ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট – প্রতিবন্ধী সেবা ও
সাহায্য কেন্দ্র, রূপসা, খুলনা এবং পরিচালক – আদিত্য ক্লিনিক। স্বাস্থ্য বিষয়ক
সম্পাদক –দৈনিক সুবর্ণ নিউজ। মোবাঃ ০১৬১১-১৮১৬৫৭।


No comments:
Post a Comment