সেরিব্রাল পলসিঃ কারন, প্রতিকার ও চিকিৎসা - ২য় পর্বের পর .................
চিকিৎসা পদ্ধতিঃ
বাবা-মা-রাই প্রথম লক্ষ্য করতে পারেন তাঁদের বাচ্চা বেড়ে
ওঠার পথের কোনওধাপ পেরোতে অসুবিধাতে পড়ছে কিনা। যদি কোনও ধাপ পেরোতে দেরী হয়, বাবা-মা-রা ভাবতে পারেন
তাঁদের সন্তান দেরিতে শুরু করছে ও পরবর্তীকালে ঠিক শিখে যাবে। বাবা-মাকে অবশ্যই
পেডিয়াট্রিসিয়ান বা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞকে এই বিষয়ে অবগতকরা উচিত কোনোরকম দেরী না
করে।
সেরিব্রাল পলসিকে সারানো যায় না, কিন্তু এই রোগের
উপসর্গগুলি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য অনেক চিকিৎসা পদ্ধতির সুবিধা লাভ করা যায়। যদিও,
সেরিব্রালপলসি তার ধরণ, আক্রান্ত স্থান বা
অক্ষমতার জটিলতা অনুযায়ী আলাদা হতে পারে, একটা বিশেষজ্ঞ
চিকিৎসকের দল একত্রে কাজ করে এই রোগে আক্রান্ত শিশুরবিস্তীর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি
স্থির করেন।
পেডিয়াট্রিসিয়ান, নিউরোলজিষ্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট,
অর্থোটিস্ট (বিকলাঙ্গতা ও অস্থিসন্ধির অসামঞ্জস্যতা যিনি যন্ত্র দ্বারা
দূর করতে পারেন), স্পীচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, অক্যুপেশানাল থেরাপিস্ট বা পেশাদারী শিক্ষা প্রদানের বিশেষজ্ঞ, বিশেষ ধরণের শিক্ষক এবং মানসিক চিকিৎসক, সকলে একজোট
হয়ে কাজ করেন জাতে শিশুটি তার সব অক্ষমতার সাথে মানিয়ে যতটা সম্ভব স্বাধীনভাবে
বাঁচতে পারে। এক্ষেত্রে সারা বাংলাদেশে ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র
সেরিব্রালপলসিতে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করে আসছে।
- ফিজিওথেরাপিঃ
যখনি একটা
শিশু সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত ধরা পরে, সাথে সাথেই এটা শুরু করা উচিত।
ফিজিওথেরাপির কাজ হল পেশি-গুলিকে দুর্বল হওয়া, ছোটো হয়ে
যাওয়া বা তার কর্মক্ষমতা হ্রাস পাওয়া থেকে আটকানো। একজন ফিজিওথেরাপিস্ট
বাচ্চাটিকে কিছু শারীরিক কসরত শেখান যা তাঁর পেশিকে মজবুত করে তুলবে। বিশেষ
ধরণের হাত বা পা দেওয়া হয় যারব্যবহারের ফলে পেশির প্রসারণ ও অঙ্গভঙ্গির
উন্নতি ঘটে।
- স্পীচ
থেরাপিঃ এটা
বাচ্চাদের যোগাযোগের ক্ষমতাকে বাড়ায়। শিশুদের কিছু এক্সারসাইজ সেখান হয় যা
তাদের পরিষ্কারভাবে কথা বলতে সাহায্য করে। কথাবলার জটিলতা যেখানে বেশি সেখানে
বাচ্চাকে যোগাযোগের বিকল্প পদ্ধতি, যেমন ইঙ্গিতের দ্বারা যোগাযোগ,
শেখান হয়। বাচ্চার যোগাযোগের জন্য বিশেষ যন্ত্র, যেমন কম্পুটারের সাথে যুক্ত ভয়েস্ সিন্থেসাইজার, পাওয়া যায়।
- অক্যুপেশনাল
থেরাপিঃ এই
থেরাপিস্ট বাচ্চার রোজকার কাজ, যেমন খাওয়া, জামা
কাপড় পরা, টয়লেটে যাওয়া, করতে কি
কি অসুবিধা হয় তাচিহ্নিত করে তা থেকে বেড়িয়ে আসার কাজে সহায়তা করেন। অক্যুপেশনাল
থেরাপিস্ট বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে আপনার বাচ্চার আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদা
বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করেন।
- প্লে
থেরাপিঃ এটা হল
একটা নতুন পদ্ধতি যেখানে খেলারমাধ্যমে বাচ্চারা আনন্দ পায় এবং এর ফলে তাদের
মানসিক বৃদ্ধি সঠিকভাবে হয়।এটা একটা থেরাপিউটিক ও সাইকোলজিক্যাল পদ্ধতি যেটা
বাচ্চাকে অন্যের সাথেযোগাযোগ স্থাপন ও সম্পর্ক স্থাপনে সাহায্য করে। প্লে
থেরাপি বাচ্চারশারীরিক সক্ষমতা, সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশে মানসিক
চাহিদা ও কাজ করার ক্ষমতা বাড়ায়। এই পদ্ধতি শুরু করা হয় যখন বাচ্চা খুবই ছোটো
(০ -২ বছর), কিন্তু এটা বয়ঃসন্ধির সময়ও দরকার। যত
তাড়াতাড়ি প্লে থেরাপি চালু করা হয়, বাচ্চা তততাড়াতাড়ি
উপকৃত হয়। প্রাথমিক অবস্থাতে শুরু করলে বাচ্চার ব্যবহার থেকে তারঅন্যের সাথে
যোগাযোগ সব কিছুরই উন্নতি ঘটায়।
- কাউন্সেলিংঃ
একজন
কাউন্সিলার বা সাইকলজিস্ট বাচ্চা ও তার পরিবারের সাথে এই সব অক্ষমতার সাথে
মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।
- বিশেষ ভাবে
তৈরি শিক্ষা ব্যবস্থাঃ অক্ষমতা বা মানসিক প্রতিবন্ধকতা-যুক্ত বাচ্চাদের শেখানোর
জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
·
একটা বাচ্চার জন্ম হল একটা পর্ব যা অনেক আশা, উত্তেজনা, আনন্দ-উদ্দীপনাতে ভরপুর থাকে। কিন্তু যখন বাবা-মা জানতে পারেন যে তাঁদের বাচ্চার
সেরিব্রাল পলসি হয়েছে তখন তা তাঁদের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ
সম্পর্কে তাঁদের দূরদৃষ্টি একেবারেই পরিবর্তিত হয়ে যায়। এটা অবশ্যই সময় সাপেক্ষ
ঠিকই, কিন্তু তাঁদেরকে এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে
নিতে হবে। এর মধ্যে প্রথম হল বাচ্চার অবস্থা ঠিকমত বোঝা ও সেইমত ঠিক কি সাহায্য
দরকার তা স্থির করে উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি বা থেরাপির সাহায্য নেওয়া।
·
সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত শিশুর প্রসঙ্গ উত্থাপন করা ও তার
যত্ন নেওয়া খুবই কঠিন এবং তা মানুষকে হতবুদ্ধি করলেও সেখানে আশার আল অবশ্যই আছে।
আপনি হচ্ছেন আপনার সন্তানের সব থেকে ভাল উকিল ও শ্রেষ্ঠ অবলম্বন। সেরিব্রালপলসির
বিষয় জ্ঞান-অর্জন আপনাকে সবরকম ভাবে নিজের সন্তানকে সাহায্য করার জন্য উপযুক্ত করে
তুলবে। এই রোগের সাহায্যকারী কোনও দলে যোগ দিলে আপনি যেমন আপনার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান
অন্যদের সাথে ভাগ করে নিতে পারবেন, তেমনই তাঁদেরথেকেও অনেক কিছু শিখতেও
পারবেন।
·
সেরিব্রাল পলসি উত্তরোত্তর ছড়িয়ে না পড়লেও এই রোগে
আক্রান্তরা কোনদিন ও সুস্থ হয় না। একজন মানুষ যিনি এই রোগে ভুগছেন তাঁকে অনেক
প্রতিকূলতার মধ্যেদিয়ে যেতে হয় এবং তিনি কিভাবে নিজের সামর্থ্যকে কাজে লাগাতে হয় ও
উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সম্পূর্ণ করতে হয় তাও শিক্ষা লাভ করতে পারেন। এখন অনেক বিকল্প
ব্যবস্থা ও সাহায্যকারী যন্ত্র এসে গেছে যা সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত শিশুদের
লেখাপড়া সম্পূর্ণ করতে, হবি বা ভালোলাগার কাজ করতে এবং খেলাধুলা এমনকি অবসর বিনোদনেও সহায়তা করতে
পারে।
·
প্রাথমিক পর্যায় ধরা পড়ার পর সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত
বাচ্চাদের অনেকদূর এগিয়ে যাবার প্রমাণও আছে। একটা বাচ্চা যে হাঁটতে পারত না বা
হাঁটতে শেখেনি তাকেও পর্বতারোহণ করতে দেখা গেছে। যে কখনও কথা বলতে পারবে আশা করা হয়নি, সে বা তারাও কথা বলে,
বই লিখে তাদের কথাতে ও অভিজ্ঞতা প্রকাশের দ্বারা অন্যদের অনুপ্রাণিত
করেছে এরূপও দেখা গেছে।
·
এক্ষেত্রে, বাবা-মা হলেন একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, যাঁরা নিজেদের বাচ্চাকে তার ভালোলাগার জায়গাটা খুঁজে নিয়ে প্রাথমিকভাবে
বেঁচে থাকার সব উপকরণ দিয়ে তাকে একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেন।
লেখকঃ ডাঃ বিজন বিশ্বাস, ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট – প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র, রূপসা, খুলনা এবং পরিচালক – আদিত্য ক্লিনিক। স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক –দৈনিক সুবর্ণ নিউজ। মোবাঃ ০১৬১১-১৮১৬৫৭।


No comments:
Post a Comment