সেরিব্রাল পলসি কি?
সেরিব্রাল পলসি হল এক ধরনের স্নায়বিক ভারসাম্যহীনতা যা
বাচ্চাদের মস্তিষ্ক গঠনের সময় কোন প্রকার আঘাত জনিত কারণে বা স্নায়ুকোষের ঠিকমত
কাজ না করার কারণে ঘটে থাকে। সেরিব্রাল পলসির জন্য শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের নড়াচড়া, পেশীর সক্ষমতা, কোওর্ডিনেশন বা ভারসাম্য, সবকিছুই ব্যাহত হয়। এটা হল
ক্রনিক চাইল্ডহুড ডিস্এবিলিটি বা বাচ্চাদের দুরারোগ্য অক্ষমতা।
সেরিব্রাল পলসির প্রকৃত কারণ এখনও অব্ধি অজানা। এটা দেখা গেছে যে, গর্ভাবস্থায় বা জন্মের সময় বা জন্মের প্রথম ৩ বছরের মধ্যে ব্রেন বামস্তিষ্কের আঘাত বা ক্ষতি শিশুকে সেরিব্রাল পলসির দিকে ঠেলে দেয়।
ডাক্তারদের মতে, গর্ভাবস্থায় ব্রেনের আঘাতই হল প্রায় ৭০ ভাগ শিশুরসেরিব্রাল পলসির কারণ। ব্রেন বা মস্তিষ্কে আঘাতের প্রকৃতি ও জটিলতার ওপরই নির্ভর করে বাচ্চার নার্ভ বা মোটর-এর কর্মক্ষমতা ও বুদ্ধির বিকাশ কিরকমহবে।
- গর্ভাবস্থায়
সংক্রমণঃ এটা ভ্রূণের নার্ভাস সিস্টেমের বেড়ে ওঠাকে ব্যাহত করে।
জিনগত সমস্যা, সংক্রমণ বা বাচ্চার জন্মকালীন সমস্যা থেকেও সেরিব্রাল পলসি হতে পারে।
- অকালে জন্ম
গ্রহনঃ সময়ের আগেই
যদি বাচ্চা জন্ম গ্রহণ করে ও সেক্ষেত্রে যদি আভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয় তাহলে
সদ্যজাত বাচ্চার মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে পারে। আরেকটা কারণ হল জন্ডিস। যখন
রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা খুব বেড়ে যায় তখনই জন্ডিস হয়। সাধারণত, লিভার অতিরিক্ত
বিলিরুবিনকে ছেঁকে শরীর থেকে বের করে দেয়। সদ্যজাত বাচ্চার লিভার-এর ঠিকমত
কাজ শুরুকরতে কিছুদিন সময় লাগে। কাজেই এটা খুব স্বাভাবিক যে সদ্যজাত শিশুর
জন্মের কয়েক দিনের মধ্যেই জন্ডিস হয়। ফটো থেরাপি পদ্ধতিতে এই রোগের চিকিৎসা
করা হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে, উপযুক্ত সময়ে চিকিৎসা না
করতে পারলে ব্রেনের কোষগুলিরক্ষতি হতে পারে।
- জন্মের
প্রথম কয়েক বছরঃ কঠিন অসুস্থতা, আঘাত বা ব্রেনে অক্সিজেনের ঘাটতি
ব্রেনের কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত কোরে তোলে।
- স্প্যাস্টিক
সেরিব্রাল পলসিঃ এটা বেশী সংখ্যক বাচ্চার ক্ষেত্রে দেখা যায় যদিও এই
রোগের প্রখরতা সব সময় এক নাও হতে পারে। এই প্রতিবন্ধকতারও চারটে ভাগ আছেঃ
- হেমিপ্লেজিয়া- একই দিকের হাত ও
পা আক্রান্ত হয়; হাতই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- প্যারাপ্লেজিয়া-দুই পা এই
রোগের আওতায় আসে; হাত খুবই সামান্য প্রভাবিত হয় বা একেবারেই রোগের আওতাতে আসে না।
- কোয়াড্রিপ্লেজিয়া
বা টেট্রাপ্লেজিয়া-দুটো হাত ও দুটো পা সমভাবে আক্রান্ত হয়।
- ডাইপ্লেজিয়া-এটা হল প্যারাপ্লেজিয়া ও
টেট্রাপ্লেজিয়ার মধ্যবর্তী অবস্থা; এক্ষেত্রে দুটো পা-ই সমভাবে
ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- আথেটয়ড বা
ডিস্কাইনেটিক সেরিব্রাল পলসিঃ এরবৈশিষ্ট্য হল পেশির গঠন ও চলাচল খুবই কম এবং মাথা, হাত ও পায়ের
অনিয়ন্ত্রিত ঝাঁকুনি, যা অনুভূতি বা টেনশন এর সাথে সাথে
বাড়ে আর বিশ্রামের সময় কমেযায়।
- আটাক্সিক
সেরিব্রাল পলসিঃ এটা খুবই কম দেখা সেরিব্রাল পলসি যার বৈশিষ্ট্য হল
দুর্বলতা, চলাফেরার অসুবিধা ও একই ভাবে না থাকতে পারা। ব্যাপক অর্থে, ফাইন মোটর স্কিলের অসুবিধা ও চলা ফেরার সমস্যাটাই এখানে প্রধান।
- বিভিন্ন
সেরিব্রাল পলসির মিশ্র অবস্থাঃ বিভিন্ন ধরণের সেরিব্রাল পলসির সমন্বয়; যদিও স্প্যস্টিসিটি
ও আথেটোসিস এই দুই প্রকারের সমন্বয়ই বেশি দেখা যায়।
নিচে লেখা বিশেষ বিশেষ লক্ষণগুলি
সেরিব্রাল পলসির ক্ষেত্রে দেখা যায়:
- স্থায়ী এবং
অচিকিৎসা যোগ্য: এক্ষেত্রে, মস্তিষ্কের আঘাত বা ক্ষতি যাহয় তা
স্থায়ী এবং তা উপযুক্ত চিকিৎসার দ্বারাও সেরে ওঠে না। আঘাত প্রাপ্ত মস্তিষ্ক
শরীরের অন্যান্য অংশের মত সেরে ওঠে না। যদিও, সংশ্লিষ্ট
অবস্থার সার্বিক উন্নতি বা অবনতি দুটোই ঘটতে পারে।
- নন্-প্রগ্রেসিভ:
অর্থাৎ, পরবর্তীকালে মস্তিষ্ক বা ব্রেনের আর কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয় না।
- দুরারোগ্য:
যে ব্যক্তি সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত তাঁকে জীবনভর একই অবস্থাতে বেঁচে থাকতে
হয়।
- মোটর ডিস্অর্ডার
- সেন্সারী
ইমপেয়ারমেন্ট বা সেন্সারী নার্ভের ক্ষয়ক্ষতি
- কানে শোনার
অক্ষমতা
- মনঃসংযোগের
অভাব
- ভাষা ও
উপলব্ধির অভাব
- মেন্টাল
রিটার্ডেশন বা বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতা
- ব্যবহার
জনিত অসুবিধা
- শারীরিক
অসুস্থতা
- বার বার জ্ঞান হারানো বা ফিট্ হওয়া
প্রধান বিষয়
- বাচ্চা
বয়সে সেরিব্রাল পলসি হল সব থেকে নিকৃষ্ট মানের শারীরিক বা মোটর-জনিত অক্ষমতা।
- সমগ্র
পৃথিবীতে, প্রায় ১৭ মিলিয়ন লোক সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত।
সংশ্লিষ্ট অবস্থা দেখে, চিকিৎসক ঠিক কোথায় এবং কতোটা জটিল অসামঞ্জস্যতা আছে তাও নির্ণয় করতে পারেন
। এই চিহ্নগুলি প্রত্যেক বাচ্চার ক্ষেত্রে একনাও হতে পারে যেহেতু সকলের ব্রেন বা
মস্তিষ্কের আঘাতের পরিমাণ এক নয়।
- মাস্ল টোন
বা মাংসপেশির গঠনঃ স্বল্প বা অতিরিক্তপেশীর গঠন – অলস হাত-পা,
খুব শিথিল বা খুবই শক্ত হাত-পা, অনিয়মিত
পেশীর সঙ্কোচন, গাঁট বা গ্রন্থিগুলির একত্রিত হয়ে
যাওয়ার ফলে সঠিক ভাবে নড়াচড়া নাকরতে পারা। এর ফলে হাঁটাচলা, বসে থাকা বা দাঁড়ান কোনটাই অবলম্বন ছাড়াসম্ভব হয় না।
- চলাচলের
সামঞ্জস্যতা ও তার নিয়ন্ত্রণঃ মাংসপেশির গঠনের অসামঞ্জস্যতা বাচ্চাদের হাত-পা, শরীরের নড়াচড়াকে
নিয়ন্ত্রণ করে। পেশীর গঠনের এই অসামঞ্জস্যতার জন্যই বাচ্চাদের হাত-পা কুঁকড়ে
থাকা বা শিথিলভাবে থাকা বা ক্রমাগত কাঁপতে দেখা যায়। উদাহরণ স্বরূপ, একটা বাচ্চা, ৬ মাসবয়সেও বসতে বা উল্টোতে পারে
না, অথবা ১২-১৮ মাসের পরেও হাঁটতে পারে না, এবং তারও পরে হয়তো বা, নিজের কাজ, যেমন লেখা, দাঁত মাজা বা জুতো পরা, এগুলিকরতে পারে না।
- অঙ্গভঙ্গিঃ
সেরিব্রাল
পলসি ভারসাম্য ও অঙ্গভঙ্গিকে ব্যাহত করে। যখন বাচ্চারা বিভিন্ন ভঙ্গিতে বসে
তখন পস্চারাল রেসপন্স করাটা খুবই স্বাভাবিক। সাধারণত, সামনে পা ছড়িয়ে বসা
একটা বাচ্চার স্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি। কিন্তু সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত বাচ্চার
পক্ষে এইভাবে বসাসম্ভব নয়।
- ভারসাম্যঃ নার্ভ বা
মোটরের অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ করবার ফলেই বাচ্চাদের ভারসাম্য বা ব্যালেন্সের
প্রবলেম বা অসুবিধা দেখাযায়। বাবা-মা-রা এই অসংগতির চিহ্নগুলো যখন বাচ্চারা
বসতে শেখে বা উঠে দাঁড়ায় বা হামা দেয় বা হাঁটতে শেখে তখন লক্ষ্য করতে পারেন।
সাধারণ ভাবেশিশুরা তাদের হাতের সাহায্যেই বসা, হাঁটা, পরবর্তীকালে
নিজের কাজ নিজেরাইকরতে শেখে। কিন্তু যদি একটা বাচ্চা কারো সাহায্য ছাড়া বসতে বা
দাঁড়াতে নাপারে, তখন সেটা সেরিব্রাল পলসির চিহ্ন বলে ধরা হয়।
- গ্রস্
মোটর ফাংশনঃ হাত-পা ও বিভিন্ন পেশীর উপযুক্ত নাড়াচাড়া দ্বারা
সার্বিকভাবে চলাচল সম্পন্ন করাই হল গ্রস্ মোটর ফাংশন। যেভাবে একটা শিশুর
ব্রেন গড়ে ওঠে, সে একটা নির্দিষ্ট সময়ে কিছু কিছুনির্দিষ্ট কাজ করতে সক্ষম হয়।
কিন্তু যদি সেই কাজ করতে তার নির্দিষ্ট সময়ের থেকে বেশি সময় লাগে বা
নির্দিষ্ট সময়ে সে ঠিকমতো সেই কাজ করতে না পারে, যেমন
হামাগুড়ি দেওয়ার সময় এক দিকে হেলে থাকা, কারো সাহায্য
ছাড়া হাঁটতে নাপারা, এগুলি সেরিব্রাল পলসির লক্ষণ হতেও
পারে।
- ফাইন মোটর
ফাংশন: যথাযথ ও
সন্নিহিত পেশীর চলাচলকেই ফাইন মোটর ফাংশন বলা হয়। ফাইন মোটর কন্ট্রোল-এর
মধ্যে অনেক কাজই পড়ে যেগুলো শিশুরা শেখে, যেখানে শারীরিক ও মানসিক দুই-এরই
সম্মিলিত প্রয়াস লাগে। বাচ্চা যত বেড়ে উঠতে থাকে তার এই সকল দক্ষতা দেখা যায়।
অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা অপেক্ষাকৃত দেরীতে ফাইন মোটর কন্ট্রোল এর প্রকাশ
সেরিব্রাল পলসির সম্ভাব্য কারণ।
- ওরাল মোটর
ফাংশনঃ ঠোঁট, জিভ, মাড়ির প্রকৃত ব্যবহারের ফলেই মানুষ কথা বলে, খায়
বা পান করে। এই সবই হল ওরাল মোটর ফাংশন। একটাবাচ্চা, যে
সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত, তার ওরাল মোটর ফাংশনও ঠিকমত
কাজ করেনা; জার ফলে তার কথা বলতে, চেবাতে, খেতে অসুবিধা হয়। ওরাল মোটর
ফাংশনশ্বাস-প্রশ্বাস, কথা বলা এই সব কিছুকেই কব্জা করে।
এপ্রাক্সিয়া ওডিসারথ্রিয়া হল স্নায়বিক বাচনভঙ্গির অসামঞ্জস্যতা যা সেরিব্রাল
পলসির জন্যহয়।
· শিশুর প্রথম তিন বছরের মধ্যেই সেরিব্রাল পলসির উপসর্গগুলি
দেখা যায়। এইরোগ মানুষের শরীরের যে কোনও অঙ্গকে আক্রমণ করতে পারে এবং তা
প্রত্যেকের ক্ষেত্রে আলাদা হয়। কিছু বাচ্চার খুবই সামান্য অসুবিধা দেখা যায় আবার
কেউকেউ ভীষণ রকম অক্ষম হয়। একটা বাচা হয়তোবা একটু দেরিতে হামা দেওয়া, বসা, হাঁটা বা কথা বলা শিখতে পারে।
· আরও কিছু উপসর্গ, যেমন নিশ্বাসের অসুবিধা, কোনও কিছু হাত দিয়ে ধরার অক্ষমতা, চিবোতে অসুবিধা,
ক্লান্তি, কারো সাহায্য ছাড়া না বসা বা
দাঁড়ানো, শুনতে না পাওয়া, শরীরের কোনও
অংশে যন্ত্রণা হওয়া এইসব উপসর্গ নিজ নিজ বাচ্চাদের ক্ষেত্রে প্রকাশ পায় কিনা তা
বাবা-মাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
(২য় পর্বে রোগ পরীক্ষা ও চিকিৎসা সম্পর্কে
লেখকঃ ডাঃ বিজন বিশ্বাস, ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট – প্রতিবন্ধী সেবা ও
সাহায্য কেন্দ্র, রূপসা, খুলনা এবং পরিচালক – আদিত্য ক্লিনিক। স্বাস্থ্য বিষয়ক
সম্পাদক –দৈনিক সুবর্ণ নিউজ। মোবাঃ ০১৬১১-১৮১৬৫৭।


No comments:
Post a Comment